কবিতা বিষয়ে / প্রবীর রায়
দেখতে দেখতে কবিতা চর্চার
সময় চল্লিশ বছর কেটে গেল।কবিতা কাকে বলব, কীভাবে তা হয়ে ওঠে,এই প্রশ্নের উত্তর আজও
আমার কাছে নেই।মহান কবিদের বলা কথাগুলো আমরা প্রায়ই উদ্ধৃত করি।কিন্তু তা কেবল
কবিতা সম্পর্কে আমাদের ধারনা দেয়।কোনও সংজ্ঞা নির্দেশ করেনা।আমার জ্ঞানী বন্ধুদের
ধারনাও বিভিন্ন রকমের।কারও কাছে ব্যাকরণসম্মত ছন্দবদ্ধ কাব্যিক শব্দসমষ্টিই
কবিতা।কারও কাছে কবিতাকে আবৃত্তিযোগ্য করে তোলাটাই মূল লক্ষ্য।কেউ কবিতায় ভাবের
ব্যাখ্যা চান।কেউ কেউ কবিতার বিষয়কে প্রধান ভাবেন।কেউ শব্দের আভিধানিক অর্থের
বাইরে তার ব্যবহারে নিজের অনুভবকে সঙ্কেতিত করেন।কবিতায় চেতন
অবচেতন এবং অতিচেতনার কথাও ভাবেম কেউকেউ।
কাব্যই তো আমাদের সাহিত্যের
প্রথম প্রকাশ ভঙ্গী।প্রথমে সংস্কৃত ও পরে বাঙলায় পন্ডিত ব্যক্তিদের বিশ্লেষনে ছন্দের নানা আকার
প্রকার নির্দেশিত হয়েছে।তার অনুসরনেই বাঙলা কবিতার ছন্দ চর্চা।বাঙলা গদ্যকবিতার
বয়েস বেশী নয়।এককথায় তাকে আমরা গদ্য ছন্দ বলি।গদ্যে কবিতার মুক্তি।যে পথ স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন।
আমার মনে হয় পৃথিবী
ছন্দময়।প্রকৃতি মানুষ আমাদের সম্পর্ক সবই এক একটি ছন্দে চলে।আমাদের কথা বলাও
একপ্রকার ছন্দ অনুসরন করে।একেকজনের বলায় একেকরকম ছন্দ।সেই গদ্যছন্দের বৈচিত্র্যকে
হয়তো ভবিষ্যতের ছান্দসিকেরা চিহ্নিত করতে পারবেন।তখন হয়তো কবিতায় ছন্দ থাকবে কি
থাকবেনা, এই বিতর্ক অবান্তর হয়ে যাবে।
আমাদের কবিতা সম্পর্কে
প্রাথমিক ধারনা গড়ে ওঠে স্কুলপাঠ্য কবিতা পড়ে আর আবৃত্তি শুনে।কবিতার ব্যাখ্যা
করার মধ্য দিয়ে রসগ্রহণ আর সহজ বোধ্যতাই সেখানে অন্যতম শর্ত হয়ে ওঠে।
আবৃত্তিকারেরা তাদের সুকন্ঠ এবং স্বরক্ষেপনের কৌশলে কবিতাকে নিবেদন করেন। আবৃত্তি
একটি পৃথক শিল্প, তাই তাঁদের স্বাধীনতা আছে।অধুনা আবৃত্তিকারেরা যন্ত্রানুসঙ্গ এবং
আলোছায়ার খেলাতেও কবিতার প্রানদানের চেষ্টা করেন।এখনকার কবিতাচর্চা এমন এক জায়গায়
নিয়ে গেছে কবিতা হয়ে উঠেছে একান্ত পাঠের কবিতা।শব্দের নিঃস্পৃহ উচ্চারনে পাঠকের হৃদয়ে তা
সঞ্চারিত করে এক অনির্বচনীয় অনুভুতির অভিজ্ঞতা।বোঝা না বোঝার
প্রশ্নের থেকেও এখানে ভাবজগতের এক গভীরতর ছোঁয়া পাঠক পেয়ে
যান।এই কবিতাগুলি কখনই আবৃত্তিযোগ্য নয়।আর আবৃত্তিকারের পরিবেশনার গুণে কবির
অপেক্ষাকৃত দুর্বল কবিতাগুলিই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কবিতা রচনাকারীরা যেমন
স্পষ্টত দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছেন,পাঠকেরাও তাই।যারা কবিতায় ভাবের ব্যাখ্যা চান,তারা কবিতাকে
বুঝতে চেষ্টা করেন শব্দের অভিধানগত অর্থ আর ব্যবহারের সংস্কারগত অর্থের মধ্য
দিয়ে।সমকালীন কবিতার পাঠকের কাছে শব্দ তার ধ্বনি ও ব্যবহারের মধ্য দিয়ে
সামগ্রিকভাবে কবিতায় তার ব্যাঞ্জনাকে পেতে চান।তার বোঝা না বোঝার থেকেও অনুভবের
জগতে অনির্বচনীয় স্বাদ তাকে তৃপ্তি দ্যায়। তিনি একপ্রকার অসহায়ও।কেননা ভাললাগার
ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননা।তা করতে গেলে তাকে আরএকটি কবিতাই লিখে ফেলতে হয়।
বিজ্ঞানের
অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রা,সামাজিক সম্পর্ক সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন
এসেছে।অন্য ভাষা এবং প্রযুক্তির বিভিন্ন শব্দের গ্রহণে বাঙ্গলা ভাষা অনেক সমৃদ্ধ
হয়েছে।বাঙলা কবিতায়ও তাই অন্য ভাষার শব্দেরও ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠেছে।এই
পরিবর্তনকে কবিতার পাঠকেরা অনেকেই গ্রহণ করেছেন সময়ের চিহ্ন হিসেবে।
---
কবিতায় কি বলতে
চেয়েছেন, এই প্রশ্নে অনেকেই কবিতার বিষয়কে স্পষ্টভাবে জানতে চায়।প্রেমের কবিতা
প্রতিবাসের কবিতা প্রকৃতির কবিতা এমন লেবেল লাগান কবিতা পাঠের অভ্যাসেই তাদের এহেন
প্রশ্ন।সমকালীন কবিতাকে বিষয়হীন বলাটাও ঠিক নয়।কোনও বিষয় কবির মনে যে অনুভুতির
সঞ্চার করে তাকে গভীর থেকে তুলে দংকেতিত করা এবং সেই সংকেত পাঠকের কাছে পৌঁছে
দেওয়ার কথাই কবি ভাবেন।আমার নিজের কবিতার ক্ষেত্রেও তাই।আমি কিছু বলতে চাই।নিজের
মত করেই বলতে চাই।পাঠককে কিছু বোঝাতে চাইনা।হাততালির পরিবর্তে পাঠকের নির্বাক
অবস্থাই আমার কাম্য।
সত্তর
দশক,ছাত্রাবস্থায় আমার লেখালিখির শুরু।পাঠক হিসাবে পঞ্চাশ দশকের আত্মজৈবনিক কবিতার
আবেগতরল উচ্চারণগুলির বদলে অন্য কিছুর খোঁজ ছিল।শ্রুতি অ্যান্টিপোয়েট্রি হাংরির
কবিতাপাঠ ওইসময় আমাকে নতুন ভাবনায় অনুপ্রানিত করে। গতানুগতিক কবিতাচর্চার বাইরে
অন্যকোনও ভাবে নিজের কথা বলার কথা ভেবেছিলাম।সেইমত আমার লেখালিখি,আগের লেখা
কবিতাগুলিকে বাতিল করে নতুন করে এগোনো। আজও সেই পথেই হাঁটছি নিজের মত করে।যারা
বাঙলা কবিতায় নতুন পথের সন্ধান করেছেন কিংবা করছেন, তাঁরা আমার বন্ধু।দীর্ঘ
পরিক্রমায় দেখেছি,বাংলা কবিতার চর্চা ক্রমশ এক পরিনতির দিকে চলেছে।সেখানে কবিতা
তার ব্যাকরণ অনুসারী স্বীকৃত কবিতার জনপ্রিয়তার পথ ছেড়ে নতুনের দিকে যাত্রা শুরু
করেছে।তরুন কবিদের কবিতাচর্চা সেইদিক নির্দেশ করছে।
জয় হোক নতুন
কবিতার।
