আমার ছাত্রজীবন ষাঠ দশকের শেষ দিকে। তখন অলিখিত নিয়ম ছিল
ভালো রেজাল্ট করা ছেলেরা পড়বে বিজ্ঞান পরের ধাপে বানিজ্য আর বাকীরা কলাবিভাগ। এখন
দিনকাল পাল্টেছে। মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে। অভিভাবকেরা তাদের সন্তানের ওপরে কোনও
কিছু চাপিয়ে দ্যায়না। বিজ্ঞান পড় আর যেমন করে হোক ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনীয়ার হও,এই
ঝোঁক অনেক কমেছে।কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও কবিতার দিকে ঝুঁকে পড়ছিলাম তখন থেকেই
আস্তে আস্তে। আমাদের ইংরাজী শিক্ষক ছিলেন কেদার ভাদুড়ী। তিনি আমায় শোনালেন
জীবনানন্দ দাশের কবিতা। অদ্ভুত শিহরহরণ খেলে গেল। তখন থেকেই কবিতার শিকড়ের খোঁজ।
আমার ইঞ্জিনীয়ারীং সহপাঠী একদিন আমার পড়ার টেবিলে জীবনানন্দের বই দেখে বলেছিল,সাধু
সন্ন্যাসীদের বই পড়ছিস? তখন অবাক হলেও পতে ভেবেছিলাম ওর মন ও মগজ ইঞ্জিনীয়ার হবার
জন্যই তৈরী। আমি বোধ হয় কিঞ্চিৎ বেমানান।কলেজের ক্লাসনোটের দুপাশ কবিতায় ভরে যেত।
ক্লাসের তিন চারজন কবিতা লিখত । ওদের সাথেই ছিল মেলামেশা আড্ডা।
এভাবেই ইঞ্জিনীয়ারীং পড়া শেষ হল। মনে হল অপূর্ণ সাধটা এবার
পূরণ করে নেই।বন্ধুদের প্ররোচনায় বাবাকে বললাম, আমি বাংলায় স্পেশাল অনার্স পড়তে
চাই। বাবার স্পষ্ট জবাব, তুমি তোমার লাইনে কিছু পড়তে চাও পড়। কিন্তু সাহিত্য নিয়ে
পড়াটা তোমার শিক্ষা যোগ্যতায় বিচ্যুতি ঘটাবে। এই দুটোকে মিশিয়ে ফেলোনা। তারপর মন
থেকে এইভাবে সাহিত্যপাঠের কথা ঝেড়ে ফেলেছি।কর্মজীবনেও এটা মেনে চলেছি। মনে আছে
একদিন সংস্থার পরিচালকদের সামনে চেয়ারম্যান জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা একজন কবিকে কি
জোনাল ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া যায়? আমি মৃদু হেসে বলেছিলাম, কেবলমাত্র একজন
কবিকেই এই দায়িত্ব দেওয়া যায়। তার কল্পনাশক্তি দুরদর্শিতা অনেক বড়ো বাধাকে অতিক্রম
করতে সাহায্য করবে। আজ আমার অভিজ্ঞতা বলে কবিতা শিল্প চর্চায় যারা ঐ বিষয়ে
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণ করেনি তারা অনেক বেশী মুক্তচিন্তার অধিকারী।
নিজের কথার সাতকাহন বলতে বসার কারন হল শিক্ষার জন্য কোনও
কিছুই চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। নেশার সঙ্গে পেশাকে মেলানোর মত আনন্দ নেই। এওতো দেখেছি
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছাড়াই সাহিত্য ভাবনায় মৌলিক ,তুলির টানে নিজস্বতা , অভিনয়ে
শিক্ষণীয়। অতএব অঙ্গনের সমস্ত দরজা খোলা থাকুক।মুক্ত হাওয়ায় খেলা করুক শেখার
ইচ্ছেগুলি।
শিক্ষা শব্দটি শুধু পুঁথিগত বিদ্যাকে নির্দেশ করে। কিন্তু
তার সাথে যখন দীক্ষা শব্দটির যোগ হয়ে যায় তখন তার ইঙ্গিত বৃহত্তর ভাবনায় নিয়ে যায়।
এই দীক্ষার অভাবেই আচার ব্যবহার ভঙ্গি মেলামেশা কিছুই সাংস্কৃতিক মান কিংবা
পারিবারিক সুনামকে বজায় রেখে সমাজের মানানসই হয়ে উঠতে পারেনা।পুর্ন মানুষ হতে গেলে
শিক্ষার সাথে দীক্ষারও প্রয়োজন আছে। প্রকৃতি সমাজ সম্পর্ক থেকে তা অর্জন করতে হয়।
প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চপদস্থকেও না হলে অশিক্ষিত মনে হয়।এই বিশ্ব এক সুবিশাল
বিদ্যালয়।এ থেকে শিক্ষা আহরণ করতে পারে যে তার দিকেই
চেয়ে থাকে মানুষ। -(শিক্ষা দীক্ষা)- প্রবীর রায় শ্যামলছায়া উকিলপাড়া জলপাইগুড়ি
৭৩৫১০১ ফোন-৯৪৩৪০৬১৭৯৪
No comments:
Post a Comment